“নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ)আইন ২০১৩: একটি বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনা”

- Dr. Md. Abdul Alim

prison-door-shutterstock_108487772-731x39521

Published On - May 21, 2016 [Vol. 4, Jan - Jun, 2016]

Abstract

The phenomenon of custodial crime is not a new in Bangladesh. Torture in various forms was widely prevalent in age of laws and philosophy though the police plays vital role in safeguarding our life, liberty and freedom. Kautilya’s Arthasatra speaks about various kinds of torture such as burning of limbs, tearing by wild animals, tramping to death by elephants and bulls, cutting of limbs and mutilation etc. Police brutality handling  with suspect is referred to in some context and the Bangladesh Police is no exception. Interrogation of a person whether he be a witness or suspect or accused, is a difficult and fragile exercise for any police officers under pressure of work and driven by a desire to achieve quick results. For these they leave the path of patient and scientific interrogation and way out to the use of force in different forms to pressure the witness/suspect/ accused to disclose all the facts known to him. The police must bear faithful commitment to the Constitution of Bangladesh and respect and uphold the rights of the citizens as guaranteed by International Laws. Considering article 5 of the Universal Declaration of Human Rights and article 7 of the International Covenant on Civil and Political Rights, both of which provide that no one shall be subjected to torture or to cruel, inhuman or degrading treatment or punishment, the People’s Republic of Bangladesh have agreed on the law of Torture, Custodial Death ( Prevention) Act 2013.

১.১ ভুমিকা

আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনা ঘোষণা করে রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য,স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হবে। বাংলাদেশে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে জনসাধারণকে নির্যাতনের ঘটনা প্রায়ই শোনা যায়। এর বেশিরভাগ ঘটনা ঘটে উক্ত বাহিনীর হাতে আটককৃত থাকার সময় বা নিরাপত্তা হেফাজতে বা রিমান্ডে থাকার সময়। অথচ এ ধরনের নির্যাতন প্রতিকারের তেমন কোন কার্যকর আইন না থাকা ও আইন প্রয়োগ না করা এবং অনেক ক্ষেত্রে শাস্তি না হওয়ার  কারণে এরূপ অমানবিক ঘটনাগুলোর বিচার হয় না। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারা নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু কখনোই সমর্থনযোগ্য নয় এবং এরকম ঘটনা ঘটলে তদন্ত করে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহন করা উচিত। নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর  ঘটনাগুলোর প্রকৃত তথ্য প্রকাশিত হয় না এবং ক’জন সদস্যের বিচার হয়েছে সেটি নিয়ে সুনির্দ্দিষ্ট কোন তথ্য পাওয়া যায় না। এটাও দায় মুক্তির একটা অংশ হিসাবে রয়ে গেছে। নির্যাতনমূলক আচরণ ও শাস্তি নিষিদ্ধ করার আন্তর্জাতিক ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার  জন্য ২০১৩ সালের ২৭ অক্টোবর সংসদে  নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ)আইন পাস করে। এই প্রবন্ধে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও দলিল বিশ্লেষণের মাধ্যমে উক্ত আইনে নির্যাতনের সংজ্ঞা, অপরাধের তদন্ত ও বিচারের সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি আইনটি বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা দূর করে কিভাবে  যুগোপযোগী করা যায় তাঁর দিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

১.২ হেফাজতে মৃত্যু  আইনের ইতিহাস

আমাদের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিশেষ করে পুলিশ সদস্যরা মহান মুক্তিযুদ্ধে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল তা অবিস্মরণীয়। আজ তারা আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত থেকে জনগণের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান,অপরাধ প্রতিরোধ ও দমনের মহান দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে। গত দুই দশকে জঙ্গীবাদ দমন এবং নিয়ন্ত্রনে বাংলাদেশ পুলিশ দক্ষতার সাথে প্রধান ভুমিকা পালন করছে। পুলিশের মতো আর এমন কোন চাকুরী কি আছে যাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাত দিন কর্তব্য পালন করতে হয়? প্রকৃতপক্ষে যারা নিজের জীবন বাজি রেখে অন্য মানুষের জীবন রক্ষার কাজে প্রতিনিয়ত সচেষ্ট তারা তো মহামানব। বর্তমানে কিছু কিছু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের কারণে সকল পুলিশ বাহিনীকে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।  স্বাধীন দেশে সাধারণ জনগণের সাথে অত্যন্ত মানবিক ও সহনশীল আচরণ করে পুলিশ জনগণের বন্ধু হোক। কখনো কিছু সংখ্যক ব্যক্তির অমানবিক নির্যাতনমূলক আচরণের কারণে পুলিশকে ঘৃণিত হতে হচ্ছে। তাই ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তির যাবজ্জীবন সাজার প্রস্তাব রেখে সংসদে একটি বেসরকারি বিল উত্থাপন করেন সরকারি দলের সাংসদ সাবের হোসেন চৌধুরী। স্পিকার বিলটি বেসরকারি সদস্যদের বিল এবং বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত প্রস্তাব-সম্পর্কিত কমিটিতে পাঠিয়ে দেন। বিলের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জনাব সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন,রাষ্ট্রের বিভিন্ন দপ্তর,বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জনগণের মৌলিক অধিকারের কথা ভুলে যান ফলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না।  তিনি বলেন,সাধারণ মানুষকে সরকারি প্রশাসনযন্ত্র এবং পুলিশের বেআইনি আচরণ,অত্যাচার-নির্যাতন থেকে রক্ষা,ন্যায়বিচারের সুবিধা নিশ্চিত এবং আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাকল্পে এ বিলের প্রস্তাব করা হয়েছে।[1] অতীত অভিজ্ঞতা হতে দেখা যায়,বেশিরভাগ জনকল্যাণকর বেসরকারি বিলই আলোর মুখ দেখেনি। বর্তমান সরকার নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু নিবারণে প্রস্তাবিত বিলটি পাস করেছেন  এবং দোষীদের বিরুদ্ধে  ব্যবস্থা নিয়ে রাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের মৌলিক মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে সচেষ্ট হয়েছেন।[2] গত বছর ২০১৫ সালের মার্চে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে  পুলিশ সদর দপ্তরের পাঠানো প্রস্তাবে এই আইনের কিছু ধারা পরিবর্তন ও বাতিলের সুপারিশ করা হয়।[3]  সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মাননীয় সাংসদ সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন,“এ আইন করার আগে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে আমরা বিশেষজ্ঞ হিসেবে সুলতানা কামাল,আমীর-উল ইসলাম,অ্যাটর্নি জেনারেল ও আবদুল মতিন খসরুর মতামত নিয়েছি। আমি আইনটি এনেছিলাম একজন ভিকটিম হিসেবে,আমি তো জানি হেফাজতে কী হয়।”[4] এই আইনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে ১৯৮৪ সালে নিউইয়র্কে নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর,অমানবিক,লাঞ্ছনাকর ব্যবহার অথবা দণ্ডবিরোধী একটি সনদের স্বাক্ষরিত দলিলের মাধ্যমে বাংলাদেশ অংশীদার হয়েছে এবং এই সনদের ৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পক্ষ রাষ্ট্রগুলো নির্যাতনমূলক আচরণ ও শাস্তিকে তাদের রাষ্ট্রের গুরুতর প্রকৃতির শাস্তির বিধান করে ফৌজদারি অপরাধভুক্ত করবে।[5]  এছাড়া মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র ১৯৪৮ এর ৫ অনুচ্ছেদ মতে কাউকে নির্যাতন অথবা নিষ্ঠুর,অমানুষিক অথবা অবমাননাকর আচরণ অথবা শাস্তি ভোগে বাধ্য করা চলবে না এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৫)অনুচ্ছেদে দণ্ড ও নির্যাতন নিষিদ্ধ করা হয়েছে আর তাই নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ)আইন,২০১৩ প্রণয়নের প্রয়োজন ও সমীচীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই আইনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে কারও মৃত্যু হলে দোষী ব্যক্তির যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আইনটিতে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে অভিযুক্ত ব্যক্তির ওপর তার নির্দোষিতা প্রমাণের দায়ভার দেয়া। এটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নির্যাতনের পথ অনুসরণ থেকে নিবৃত্ত করার  কাজে লাগতে পারে। নির্যাতনে প্ররোচনা এবং সহায়তা করাকেও শাস্তিযোগ্য করা এবং আদালতে কেউ হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ করলে,তার ডাক্তারি পরীক্ষার ব্যবস্থা করার বিধান সুফল দিতে পারে। হেফাজতে মৃত্যু বলতে সরকারি কোনো কর্মকর্তার হেফাজতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু, এছাড়াও অবৈধ আটকাদেশ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক গ্রেপ্তারকালে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুকেও অন্তর্ভুক্ত করে। এমনকি কোনো মামলায় সাক্ষী হোক বা না হোক জিজ্ঞাসাবাদকালে মৃত্যুও হেফাজতে মৃত্যুর অন্তর্ভুক্ত হবে। গ্রেপ্তারের সময় মৃত্যু এবং জিজ্ঞাসাবাদের সময় মৃত্যুকেও হেফাজতে মৃত্যুর সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করার কারণে এই আইন বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে,এমনটা আমরা বিশ্বাস করি।[6]

১. ৩ হেফাজতে নির্যাতন

আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতনের উপায়সমূহের মধ্যে লক্ষ্য করা যায় কিল ঘুসি, ভয় ভীতি বা হুমকি প্রদান, মারাত্মকভাবে পিটুনি,সিলিংয়ে ঝুলিয়ে রাখা,ঘুমাতে না দেয়া, প্রজননতন্ত্রে বৈদ্যুতিক শক দেয়া, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে আটককৃতদের পায়ে গুলী করা। নিরাপত্তা হেফাজতে হত্যা, ধর্ষণ অনেক সময় নির্যাতন সইতে না পেরে অনেকে আত্মহত্যা করতেও বাধ্য হয়েছেন। হেফাজতে এ ধরনের আত্মহত্যা পরোক্ষভাবে হত্যার শামিল। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ নির্যাতন ও নিষ্ঠুর অমানবিক লাঞ্ছনাকর, অবমাননাকর দণ্ড ও ব্যবহার নাগরিকের মৌলিক অধিকাররূপে নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত  সেসবের কিছুই প্রকৃতার্থে বাস্তবায়িত হয়নি। ২০০১ সালের বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাবের হোসেন চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্লেট-গ্লাস চুরির মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করে এবং তাঁকে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করে।[7] সে সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিরোধী দলের বহু নেতা-কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন চালানো হয়েছিল। এমনকি ভিন্নমতের লেখক-বুদ্ধিজীবীরাও সরকারের জিঘাংসার শিকার হয়েছিলেন যেমন,ময়মনসিংহের সিনেমা হলে বোমা হামলা ঘটনার দায়ে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে শিকার হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ও লেখক শাহরিয়ার কবির। আবার সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অনেক কেন্দ্রীয় নেতা একইভাবে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের শিকার হয়েছিলেন। কখনো কখনো একেবারেই নিরপরাধ মানুষও কেবল নামের মিল থাকায় অথবা পূর্বশত্রুতার জের ধরে ফাঁসানোর মাধ্যমে কিংবা চাহিদামতো চাঁদা না দেয়ায় এ ধরনের নির্যাতন, হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন। বাংলাদেশে অপারেশন ক্লিন হার্ট নামের সেনা অভিযান চালানোর সময় অনেক হেফাজতে মৃত্যুর বহু ঘটনা ঘটেছে পরবর্তীতে সরকার সেনাবাহিনীকে সেটি থেকে দায়মুক্তি দিয়েছিল।

১.৪ মিথ্যা স্বীকারোক্তি ও মানবাধিকার

মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হয়েছে,সেই রাষ্ট্রের জনগণের মানবাধিকার রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। একইভাবে  সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায় যে তাদের সাংবিধানিক যে দায়িত্ব[8] পালন করার কথা অনেকক্ষেত্রে তারা জনগণের সেবক না হয়ে নির্যাতন, অমানবিক ও অশোভনীয় আচরণ  করে যা সেবা প্রদানের মনোভাবের সাথে প্রাসঙ্গিক নয়। আমরা দল, মত নির্বিশেষে সবাই চাই পুলিশ যেন শিক্ষকদের ওপর পেপার স্প্রে নিক্ষেপ না করে,নিরীহ মানুষকে হেনস্তা না করে,বিপুল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে না পড়ে অসহায় নারীদের ওপর।[9] মানবাধিকার রক্ষার দায়িত্ব সরকারি সকল কর্মচারীদের বিশেষ করে পুলিশ বিভাগের হাতে অনেকখানি ন্যস্ত। দেশে নিরাপত্তা হেফাজতেও অহরহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। জিজ্ঞাসাবাদের নামে রিমান্ডে নিয়ে সুস্থ মানুষ মেরে ফেলা হয়। লিমনের মতো ভাগ্যগুণে প্রাণটা বেঁচে গেলেও চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করে নিতে হয় অনেককে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রুবেল কিংবা কাদেরের কথা আমরা নিশ্চয়ই ভুলে যাইনি। নিরীহ এই ছাত্রদের একজনকে রিমান্ডে নিয়ে পুলিশি নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছিল অন্যজনকে থানার ওসি চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করেছিল। বাংলাদেশে নিরাপত্তা হেফাজতে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে। অথচ আইনানুযায়ী থানা হলো নাগরিকের জন্য নিরাপদতম স্থান। আর আমরা হলাম সেই হতভাগ্য রাষ্ট্রের নাগরিক যাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিকৃত লালসা মেটাতে গিয়ে সম্ভ্রম হারিয়ে প্রাণ উজাড় করে দিতে হয় প্রতিনিয়ত। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী,গত তিন বছরে পুলিশের বিরুদ্ধে অর্ধ লক্ষাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে পুলিশ সদর দফতরের সিকিউরিটি সেল এবং ডিসিপ্লিন বিভাগে। ২০১৪ সালে প্রায় ১৫ হাজার অভিযোগ জমা হয়েছে।[10] এর বেশিরভাগ ঘুষ, দুর্নীতিসহ আসামি ধরে মোটা অংকের টাকা আদায়ের জন্য নির্যাতন আবার মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে জমি ও বাড়ির দখল। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য মতে গত জানুয়ারী থেকে এপ্রিল ২০১৫ পর্যন্ত  আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে  ৭৪ জন মারা গিয়েছে। [11]

কেসস্টাডি এক

১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট দেশের ইতিহাসের জঘন্যতম বর্বরোচিত ঘটনা পুলিশ হেফাজতে ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যা ।  তখন প্রতিবাদী জনতার ওপর পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালালে  সাতজন নিরপরাধ ব্যক্তি নিহত হন। ইয়াসমিন ভুল করে ঠাকুরগাঁওগামী নৈশকোচ হাছনা এন্টারপ্রাইজে উঠে পড়ে । বাসটি রাত ৩টার পরে দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও-রংপুরের সংযোগ মোড় দশমাইল এলাকায় এসে পৌঁছায়। এ সময় উপস্থিত কয়েকজন ইয়াসমিনকে  দিনাজপুরগামী গাড়িতে তুলে দিতে চান। তবে ইয়াসমিন সকাল না হওয়ায় যেতে সাহস পায়নি। এর পর বীরগঞ্জ থেকে আসা পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানের চালক অমৃতলাল ধমক দিয়ে তাকে পৌঁছে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে নিয়ে যান। পিকআপ ভ্যানে পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মইনুল এবং আব্দুস সাত্তার বসে ছিলেন। পরে ওই এলাকার লোকজন রাস্তায় রক্তের দাগ, পাশে ইয়াসমিনের জুতা, রুমাল, হাতপাখা ও ভাঙা চুড়িও পড়ে থাকতে দেখেন। এর ঘণ্টা তিনেক পরে ব্র্যাক অফিসের সামনে ইয়াসমিনের মৃতদেহ পাওয়া যায়। এরপর পড়ে থাকা ইয়াসমিনের লাশের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরির উদ্দেশ্যে থানার উপপরিদর্শক প্রকাশ্যে লাশ বিবস্ত্র করে ফেললে উৎসুক জনতার মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয় এবং ঘটনার পরদিনই দিনাজপুরে এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং হত্যা ও ধর্ষণের বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়।

কেসস্টাডি দুই

ডিএমপির উত্তরা জোনের সহকারী কমিশনারের অফিসে রিমান্ডের এক আসামিকে অবৈধভাবে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগে তিনটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি,পরিদর্শক ও এক এসআই। পত্রিকা সুত্রে জানা যায় উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের পুল ক্লাবের মালিক সোবহান খানকে অজ্ঞাত ব্যক্তি ৩ মার্চ রাতে গুলি করে। তার পায়ে গুলি লাগে। এ ঘটনায় সোবহান বাদী হয়ে সিফাত আহমেদ রাব্বিকে সন্দেহভাজন আসামি করে ৪ মার্চ উত্তরা পশ্চিম থানায় ৩২৬ ধারায় মামলা দায়ের করেন। ৫ মার্চ সিফাতকে গ্রেফতার করে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ। তাকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠান। পরবর্তী সময় তার দু দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হলে ২৬ মার্চ তাকে কারাগার থেকে উত্তরা পশ্চিম থানায় নেয়া হয়। থানায় নেয়ার সময় সে সুস্থ ছিল। ২৭ মার্চ রাতে উত্তরা জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার উত্তরা পূর্ব থানার দ্বিতীয় তলায় তার অফিসে সিফাতকে নেন। রিমান্ডের আসামি নিতে হলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তার অনুমতি না নিয়ে  সেখানে সিফাতকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। এরপর তাকে উত্তরার একটি হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়। ওই রাতেই তাকে অসুস্থ অবস্থায় উত্তরা পশ্চিম থানায় ফেরত পাঠানো হয়। সুস্থ আসামিকে নিয়ে অসুস্থ অবস্থায় ফেরত পাঠানোয় ওই রাতেই থানার পরিদর্শক একটি জিডি করেন। একই সঙ্গে জিডি করেন মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই । ২৮ মার্চ সকালে ওসি একটি জিডি করেন। ওসি জিডিতে উল্লেখ করেছেন-২৭ মার্চ রাতে আমার অনুপস্থিতিতে রিমান্ডে থাকা সুস্থ আসামি সিফাতকে উত্তরা জোনের এসির অফিসে নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সংশ্লিষ্ট এসি,এডিসি নির্যাতন করেন। আসামিকে সুস্থভাবে নিয়ে অসুস্থ অবস্থায় পাঠানো হয়েছে।[12]

অপরাধের স্বীকারোক্তি বা দোষ কবুল সম্পর্কে সাক্ষ্য আইনের ২৪ হতে ৩০ ধারা ও ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১৬৩, ১৬৪ ও ৫৩৩ এ বিধান  আছে । কোন অপরাধের স্বীকারোক্তি আদায় যদি প্রলোভন, ভীতি এবং প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে করা হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। এমনকি কোন স্বীকৃতি পুলিশ অফিসারের কাছে বা পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় করা হলে তা সাক্ষ্য হিসাবে গ্রহণীয় হবে না। নির্যাতনের মাধ্যমে আদায়কৃত স্বীকারোক্তির কোনই আইনগত মূল্য নেই। দণ্ডবিধির ৩৩০ এবং ৩৩১ ধারায় বলপ্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধের স্বীকারোক্তি আদায়কালে কাউকে আঘাত বা গুরুতর আঘাত করার জন্য সর্বোচ্ছ ৭ এবং ১০ বছরের সাজা এবং অর্থদণ্ডের বিধান থাকলেও কার্যত এর কোন প্রয়োগ নেই বললেই চলে। রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের মাধ্যমে  স্বীকারোক্তি আদায় সংবিধানের চেতনাবিরুদ্ধ একটি অনুশীলন। সংবিধান বলেছে,কারও ইচ্ছার বিরুদ্ধে কথা আদায় করা যাবে না। সংবিধানের ৩৫(৪)ও ৩৫(৫) অনুচ্ছেদের আলোকে কোন অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না এবং কোন ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর,অমানসিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেয়া যাবে না কিংবা কারও সাথে অনুরূপ ব্যবহার করা যাবে না। আমরা দেখি সরকার পক্ষ থেকে রিমান্ডের আবেদন করে এবং নিম্ন আদালত থেকে তা মঞ্জুর করার মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে সংবিধানের ওই চেতনার লঙ্ঘন (deviation)ঘটে চলেছে সবসময়। ২০০৩ সালে বিচারপতি মো.হামিদুল হক ও বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ৫৪ ধারায় পুলিশের যত্রতত্র গ্রেপ্তার এবং তাদের আবেদনক্রমে আদালতের রিমান্ড মঞ্জুরের বিরুদ্ধে একটি বিস্তারিত ১৫ টি নির্দেশনা জারি করেন।[13] একই সাথে ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন করে তা দৃশ্যমান কার্যে পরিণত করার সুপারিশ করেছেন কিন্তু  দুর্ভাগ্যজনকভাবে নির্দেশনাসমূহ এখনও নিস্ক্রিয় ও ক্ষমতার অপব্যবহার পূর্বের চেয়েও বেড়েছে ও অব্যাহত রয়েছে। সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টের রায় নিম্ন আদালতের জন্য অবশ্যপালনীয়। তাই উচ্চ আদালতের রায় মেনে কারাগারে পৃথক কক্ষ স্থাপন এবং সেখানে অভিযুক্তের আইনজীবী ও আত্মীয়ের উপস্থিতিতে জিজ্ঞাসাবাদের প্রথা চালু হোক। সাইফুজ্জামান বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য মামলায় বিচারপতি এস, কে, সিনহা বলেন, “the custody of the police under the orders of Magistrate under section 167 of the Code and they are subjected to third degree methods with a view to extracting confessions. This is what is termed by the Supreme Court of India as “state terrorism” which is no answer to combat terrorism”[14] এছাড়া পুলিশের অন্যায় হস্তক্ষেপ হতে জনসাধারণের স্বাধীনতা রক্ষায় এই মামলায় ১১ টি অতিরিক্ত দিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে যা পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটরা পালন করতে বাধ্য। বিচারপতি এস, কে, সিনহা আরও বলেন, “The police officers and the Magistrates shall follow the requirements strictly so that no citizen is harassed nor his fundamental right guaranteed in part Ill of the Constitution at any event is curtailed.”[15]

১.৫ নির্যাতনের সংজ্ঞা

নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ)আইন ২০১৩ মতে নির্যাতন হল কোন  ব্যক্তি দ্বারা অন্যকোন ব্যক্তিকে বা তৃতীয় ব্যক্তি দ্বারা যন্ত্রণা বা কষ্ট হয়  এমন ধরনের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা যার মাধ্যমে অপর কোন ব্যক্তিকে ভয়ভীতি দেখানো;বৈষম্যের ভিত্তিতে কারো প্ররোচনা,তথ্য অথবা স্বীকারোক্তি আদায়ে;কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি প্রদানে; কারো সম্মতিক্রমে অথবা নিজ ক্ষমতাবলে কোনো সরকারি কর্মকর্তা অথবা সরকারি ক্ষমতাবলে কোন কাজ  নির্যাতন হিসাবে গণ্য হবে।[16] তবে এই সংজ্ঞায় উদ্দেশ্য শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা বা কষ্ট ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে হলে প্রযোজ্য হবে না। কোন অন্তর্নিহিত কারনে বা ঘটনাক্রমে আইনগত ব্যবস্থা যেমন মামলা চলাকালীন সময় ডিটেনশন,আদালতের আদেশে রিমান্ড অবস্থায়,কারাগারে আটক অবস্থায় নির্যাতন এই সংজ্ঞার আওতায় পড়ে না। যেখানে তথ্য অথবা স্বীকারোক্তি আদায়ে নির্যাতন সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত সেখানে এমনকি রিমান্ড অবস্থায়,কারাগারে আটক অবস্থায় যন্ত্রণা বা কষ্ট সন্দেহভাজন ব্যক্তির অসহনীয় পরিবেশে বা অসুস্থতার কারনে হতে পারে যা নির্যাতনের অন্তর্ভুক্ত নয়। আবার কোন ব্যক্তি বা সরকারি কর্মচারী তাদের অফিসিয়াল ক্ষমতা বলে প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষভাবে নির্যাতন এই সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। UNCAT ১৯৮৪ উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সামনে রেখে নির্যাতনের সংজ্ঞা করা প্রয়োজন,হয়তবা ভাষান্তর করতে গিয়ে সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি। The United Nations Convention against Torture নির্যাতনের সংজ্ঞায় বলা হয় যে,[17]

the term “torture” means any act by which severe pain or suffering, whether physical or mental, is intentionally inflicted on a person for such purposes as obtaining from him or a third person information or a confession, punishing him for an act he or a third person has committed or is suspected of having committed, or intimidating or coercing him or a third person, or for any reason based on discrimination of any kind, when such pain or suffering is inflicted by or at the instigation of or with the consent or acquiescence of a public official or other person acting in an official capacity. It does not include pain or suffering arising only from, inherent in or incidental to lawful sanctions.

নির্যাতনের সংজ্ঞায় যে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ তা হল,

১। যে শাস্তি শারীরিক বা মানসিকভাবে কঠোর যন্ত্রণা বা কষ্টের কারন হয়।

২। যখন রাষ্ট্র তার ক্ষমতা বলে নিজে বা রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের সাহায্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কঠোর যন্ত্রণার পরিবেশ তৈরির কারন হয়।

৩। যখন কোন নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে কোন তথ্য সংগ্রহ, শাস্তি বা শক্তি প্রয়োগ করা হয়।

আন্তর্জাতিক নির্যাতন প্রতিরোধ ব্যবস্থা জেন্ডার স্পর্শকাতর বিষয়গুলোকে মৌখিক, অ-মৌখিক, প্রদর্শনীর মাধ্যমে প্রকাশ করা  নির্যাতনের ব্যাখ্যায় অন্তর্ভুক্ত করে।[18] ১৯৯১ সালে আমেরিকায় ভিকটিম নির্যাতন প্রতিরোধ আইন করা হয় এবং তারা মানসিক যন্ত্রণা বা কষ্টের বিষয়টি যোগ করে।[19] আবার ২০০৬ সালের ২২ জুন  UNCAT এর সঙ্গে যুক্ত হয় The Optional Protocol to the Convention Against Torture (OPCAT) এবং ১ নং অনুচ্ছেদে কনভেনশনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয় যে জনসাধারণকে নিপীড়ন বা শোষণ হতে মুক্ত করার লক্ষে নির্যাতন রোধ, নিষ্ঠুর, অমানবিক, লাঞ্ছনাকর ব্যবহার অথবা দণ্ডবিরোধী স্বাধীন আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় সংস্থা গঠন করে প্রতিনিয়ত সতর্ক নজরদারি করতে হবে। এ কনভেনশনের ১৭ অনুচ্ছেদ মতে স্বাক্ষর দিয়ে দৃঢ়ভাবে সমর্থনকারী প্রতিটি দেশ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নির্যাতন প্রতিরোধে কমপক্ষে একটি স্বাধীন জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহন করবে।[20] OPCAT আলোকে বাংলাদেশে নির্যাতন প্রতিরোধে কোন স্বাধীন জাতীয় প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয়নি। নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ)আইন ২০১৩ আইনে মানসিক নির্যাতনকে সংজ্ঞায় আনা হয়নি, যা হতে পারে – আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোন সদস্য কর্তৃক আইনানুগ দায়িত্ব পালনকালে শক্তি প্রয়োগ বা ভীতি প্রদর্শন বা মনস্তাত্ত্বিকভাবে  চাপ প্রয়োগ করে ক্ষতি সাধন, হুমকি প্রদর্শন, নির্যাতন অথবা কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা আইনগত অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে হুমকির চাপ, অপমান, অবজ্ঞা করা যা দ্বারা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির ব্যক্তি স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয় এবং মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

১.৬ অতিরাষ্ট্রিক প্রয়োগ (Extraterritorial Jurisdiction)

জাতিসংঘ নির্যাতন বিরোধী কনভেনশনের ৫ অনুচ্ছেদে অতিরাষ্ট্রিক প্রয়োগের জন্য সদস্য ভুক্ত রাষ্ট্রকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।[21] কিন্তু নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ)আইন,২০১৩ এ অতিরাষ্ট্রিক প্রয়োগের কথা বলা হয় নাই। তাই আমরা এই বিধানটি যুক্ত করতে পারি যে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমানার বাহিরে অথবা বাংলাদেশের কোন জাহাজ বা বিমানে কোন ব্যক্তি বাংলাদেশী কোন নাগরিকের বিরুদ্ধে এই আইনের আওতাধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করলে এই আইনের বিধানাবলী কার্যকর হবে। যদি কোন ব্যক্তি বাংলাদেশের বাহির হতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অথবা বাংলাদেশের অভ্যন্তর হতে বাংলাদেশের বাহিরে এই আইনের আওতাধীন কোন অপরাধ সংঘটন করে তা হলে উক্ত অপরাধ ও তাহা সংঘটনের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া বাংলাদেশে সংঘটিত হয়েছে বলে গণ্য হবে এবং উক্ত ব্যক্তি ও অপরাধের ক্ষেত্রে এই আইনের বিধানাবলী কার্যকর হবে।

১.৭ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও ক্ষতিগ্রস্ত  ব্যক্তি

নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ এর ২(৪) ধারায় ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থা’ অর্থ পুলিশ,র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন,বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ,কাস্টমস, ইমিগ্রেশন,অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বিশেষ শাখা,গোয়েন্দা শাখা,আনসার ভিডিপি ও কোস্টগার্ডসহ দেশে আইন প্রয়োগ ও বলবৎকারী সরকারি কোন সংস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।[22] মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে,দুদকসহ অন্যান্য সরকারি,আধাসরকারি ও প্রতিরক্ষা বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এই আইনের ২(৮)ধারায় ক্ষতিগ্রস্ত  বা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বলতে এই আইনের অধীনে তার উপর অথবা তার সংশ্লিষ্ট বা উদ্বিগ্ন এমন কারো উপর নির্যাতন করা বোঝানো হয়েছে।[23] বাংলায় উদ্বিগ্ন কথাটির অর্থ এক্ষেত্রে সঠিক নয় কারন কোন নির্যাতিত ব্যক্তির জন্য পুরো সমাজ বা দেশ উদ্বিগ্ন থাকতে পারে। তাই ‘‘ভিকটিম’’ অর্থ এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধের শিকার কোন ব্যক্তি এবং উক্ত ব্যক্তির আইনগত অভিভাবক বা উত্তরাধিকারীও (legal heirs) অন্তর্ভুক্ত করা উচিত । এই আইনের মূল লক্ষ্য হল নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতিত বা মৃত বা  ক্ষতিগ্রস্ত  বা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির পরিবারকে  ক্ষতিপূরণ দেয়া। আইন মৃত ব্যক্তিকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না, রাষ্ট্র অপরাধীকে শাস্তি দিতে পারবে কিন্তু পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটির মৃত্যুতে সেই পরিবারের অসহায় নারী ও এতিম শিশুরা কি পাবে? মেহবুব বাগচি ও অন্যান্য বনাম রাষ্ট্র (২০১১) মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পুলিশের আচরণকে আদিম ও অমানবিক বলে জানায়, “the horrendous manner in which Padmini was treated by policemen was shocking and atrocious, and calls for no mercy”[24]; এবং অর্থনৈতিক শাস্তি আরোপ করে। আমাদের দেশে এই আইনের সাথে সাথে ক্ষতিগ্রস্ত বা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির পরিবারকে ক্ষতিপূরণের আইনসঙ্গত ব্যবস্থা থাকা জরুরী যার বিবেচনা হতে হবে প্রকৃত ও আইনগত ক্ষতি বিবেচনা করে। এই আইনের ১৫(১) ধারায় নির্যাতন করলে সর্বোচ্চ ৭৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, ১৫(২) ধারায় নির্যাতনের ফলে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে সর্বোচ্চ ৩ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে। একটা জীবনের মূল্য কি ৩ লক্ষ টাকা হতে পারে? তাই আইনে অন্যূন পরিমান ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকতে পারে কিন্তু সর্বোচ্চ পরিমান ক্ষতিপূরণ নির্ধারিত হতে হবে ভিকটিমের প্রকৃত শারীরিক, মানসিক ও আইনগত ক্ষতি বিবেচনা করে।

১.৮  সাক্ষীর সুরক্ষা

বিদ্যমান এই আইনে মামলার বাদী বা সাক্ষীকে বা তার পরিবারের নিরাপত্তার কোন বিধান নাই। কোন ব্যক্তি নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি বা মামলার সাক্ষীকে বা তার পরিবারের কোনো সদস্যকে হুমকি প্রদান,ভীতি প্রদর্শন বা বলপ্রয়োগ করে এই আইনের অধীন রুজুকৃত কোন মামলার তদন্ত বা বিচারকার্যে কোনরূপ গুরুতর বিঘ্ন সৃষ্টি করলে তিনি অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবে এবং উক্তরূপ অপরাধের জন্য কারাদণ্ডের বিধান থাকা প্রয়োজন। আদালতকে আরও ক্ষমতা প্রদান করা যেতে পারে,কোন ভিকটিম বা সাক্ষীর নিরাপত্তার স্বার্থে আদালত যে কোন স্থানে নিজে অথবা কমিশনের মাধ্যমে, সরাসরি বা ইলেকট্রনিক উপায়ে,কোন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ বা তাকে পরীক্ষা করতে পারবে এবং আদালত এই আইনের অধীন কোন সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা প্রতিবেদন, তাকে আদালতে হাজির হবার দায়িত্ব হতে অব্যাহতি প্রদান করে Video Conferencing মাধ্যমে বা আধুনিক পদ্ধতিতে  সাক্ষ্য হিসাবে গ্রহণ করতে পারবে। এতে সরকারি কর্মকর্তা, ডাক্তার বা সাক্ষীকে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাদ দিয়ে এক জেলা হতে অন্য জেলায় গিয়ে সময় দিতে হবে না। তাছাড়া জাতিসংঘ নির্যাতন বিরোধী কনভেনশনের ১৫ অনুচ্ছেদের বিধানটি আমাদের আইনে সংযুক্ত করা বিশেষভাবে প্রয়োজন।[25]

১.৯ অপরাধের অভিযোগ ও তদন্ত

নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন ২০১৩ এর ৪ ধারায় অপরাধের অভিযোগ দায়ের করার জন্য কোন আদালতে করবে তা সুস্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। আসামী যে আদালতে বিচারাধীন তাকে সেই আদালতে অভিযোগ করার ব্যবস্থা থাকা জরুরী। আবার আসামী পুলিশ বা জেল হেফাজতে থাকলে কিভাবে মামলা দায়ের করবে? আসামী জামিনে থাকলে দায়রা জাজের কাছে অভিযোগ করতে পারবে। ধারা ৫ অনুযায়ী পুলিশের বিরুদ্ধে পুলিশ তদন্ত করা ঠিক হবে না,অন্য কোন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক করতে হবে। মামলার তদন্ত অনুষ্ঠানের জন্য  নির্দেশ কত দিনের মধ্যে প্রদান করবেন আর না করলে কি হবে কর্তব্য কাজে অবহেলা কি না উল্লেখ করা প্রয়োজন । এই আইনের ৫(২) ধারাতে যত দ্রুত সম্ভব বা ৭ দিন বা ৩০ দিনের মধ্যে তদন্ত করে চার্জ বা চার্জ বিহীন রিপোর্ট কথাটি যোগ করা প্রয়োজন। অনেক সময় দেখা যায় পদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়ার পর শাস্তি হয়েছে,এমন নজির কম। এসব ক্ষেত্রে কনস্টেবল পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের শাস্তি পেতে হয় বেশি। অনেক সময় ভুক্তভোগীরা পুলিশের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে না পেরে আদালতের আশ্রয় নেয়। আদালতে মামলা হলেও পরে তা আর বেশি দূর এগোয় না। পুলিশের চাপে ভুক্তভোগীরা মামলা তুলে নিতে বাধ্য হয়। অভিযুক্ত কর্মকর্তারা শাস্তি না পাওয়ায় পুলিশ বেপরোয়া হতে থাকে। এই আইনের ৫(২) ধারায় আছে যে “সংশ্লিষ্ট সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি যদি মনে করেন যে পুলিশ দ্বারা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত সম্ভব নয় সেক্ষেত্রে উক্ত ব্যক্তি যদি আদালতে আবেদন করেন এবং আদালতে যদি তাহার আবেদনে এই মর্মে সন্তুষ্ট হন যে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদন যথার্থ সেক্ষেত্রে আদালত বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ প্রদান করিতে পারিবেন”।[26] একটু লক্ষ করলে দেখা যায় সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি কখন এই আবেদন করবে,অভিযোগকারী তার বিরুদ্ধে পুলিশের ফাইনাল বা যে কোন রিপোর্ট আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে? যদি এই রকম আশঙ্কা থাকে তো কেন অভিযোগকারী আবেদন করার সময় বিচার বিভাগীয় তদন্তের আবেদন করতে পারবে না। তাই আমরা বলতে চাই যে সংস্থার বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ সে সংস্থা দিয়ে তদন্ত না করে প্রতি জেলায় সরকারি, বেসরকারি প্রতিনিধিদের নিয়ে নির্যাতন বিরোধী কমিটিকে তদন্তের ভার দেয়া যেতে পারে।

১.১০ সম্পত্তি আটক ও ক্ষতিপূরণ

বাংলাদেশ জাতিসংঘ নির্যাতন বিরোধী কনভেনশন ১৯৮৪ এর ১৪(১) অনুচ্ছেদটি সংরক্ষণ করে রেখেছে।[27] অনুচ্ছেদটিতে নির্যাতনের ফলে প্রকৃত ও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়া, পুনর্বাসন এবং নির্যাতনের ফলে মৃত্যু হলে ভিকটিমের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেবার বিঁধান রয়েছে । বাংলাদেশের জন্য অনুচ্ছেদটি সংরক্ষণ করে  রাখার যৌক্তিকতা নেই।  কেননা ফৌজদারি কার্যবিধি আইনের ৫৪৫(১)ধারা, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ কিংবা এসিড অপরাধ দমন আইন ২০০২ আইনে ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিধান স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। তাই এই আইনে বিধান থাকা প্রয়োজন যে বিচারকার্যের যে কোন পর্যায়ে,স্বীয় উদ্যোগে বা কোন ব্যক্তির আবেদনক্রমে আদালত এই আইনের অধীন কোন অপরাধ সংঘটনের মাধ্যমে অভিযুক্ত ব্যক্তি কর্তৃক অর্জিত অস্থাবর বা স্থাবর সম্পত্তি আটক,অবরুদ্ধ বা বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ প্রদান করতে পারবে। আবার দোষী সাব্যস্ত হলে আদালত কর্তৃক আদেশকৃত অর্থদণ্ডের অর্থ  ভিকটিম বা তার পরিবারকে  যৌক্তিক পরিমাণে ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য তাকে আদেশ প্রদান করার বিধান সহ ক্ষতিপূরণ আদালত কর্তৃক সরাসরি অথবা প্রয়োজনে,the Public Demands Recovery Act, 1913 (Bengal Act No. III of 1913) এর বিধানানুযায়ী আদায়যোগ্য হবে।

১.১১ ক্ষমতার অপব্যবহার ও মিথ্যা মামলা

কোন সরকারি অফিসার বা সরকারি ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে বা অন্য ব্যক্তি তার অফিসকে ব্যবহার করে যেকোনো নির্যাতন করলে জাতিসংঘ নির্যাতন বিরোধী কনভেনশনের আলোকে অপরাধ হবে যা ২০১৩ সালের আইনে খুঁজে পাওয়া যায় না। কারাগার অফিসার, স্টাফ বা তাদের আদেশে কোন আসামী দ্বারা নির্যাতন, স্বাস্থ্য ও আইনগত সেবা দানকারী ব্যক্তিবর্গের নির্যাতন, প্যারা মিলিটারি কর্তৃক নির্যাতন যা শারীরিক, মানসিক, যৌন, ঘুষ বা আর্থিক বা চাকুরির  সুবিধার জন্য হোক না কেন এই আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। যেহেতু এটি একটি বিশেষ আইন তাই এর বিশেষ তদন্ত দল গঠন,বিচার পদ্ধতি ও বিশেষ শাস্তি হওয়া বাঞ্ছনীয়। যে বিধানটি থাকা আবশ্যিক তা হল কোন ব্যক্তি অন্য কোন ব্যক্তির ক্ষতিসাধন করার উদ্দেশ্যে এই আইনের অধীন মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মামলা বা মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করলে বা আইনি প্রক্রিয়ার অপব্যবহার করলে বা অন্য কোন ব্যক্তিকে তা করতে বাধ্য করলে অপরাধ হবে কিনা এবং অন্যূন সশ্রম কারাদণ্ডে এবং অন্যূন অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান থাকা দরকার।

১.১২ বিচার ও শাস্তি

 নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ)আইন ২০১৩ এর শাস্তি সংক্রান্ত ১৫ ধারাটির সংশোধন প্রয়োজন। কারণ এই আইনে সব অপরাধকে অন্তর্ভুক্ত করার পর মামলা করা হবে এই ধারাতে। তাই নির্যাতনের ফলে ব্যক্তি যদি মৃত্যুবরণ করে তার শাস্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড অথবা অন্যূন এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড কখনো হতে পারে না। যেখানে দণ্ডবিধিতে খুনের সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড ও অর্থদণ্ড শাস্তি হিসাবে রয়েছে।[28] তাই বিশেষ আইনে “অথবা” না হয়ে “এবং” হওয়া ও অর্থদণ্ড ভিকটিম ও তার পরিবারের real sufferance and legal injury সাপেক্ষে হওয়া উচিত।

১.১৩  তামাদি ও আপীল

১৬ ধারায় আপীল দায়ের করার জন্য তামাদির সময়সীমা উল্লেখ করার কোন বিধান নাই। এই বিধানটি সংযুক্ত করা যেতে পারে। তারপর ১৬(২) ধারায় বিধানটি সঠিক হয়নি যে “ক্ষতিগ্রস্ত/সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি/ব্যক্তিরাও আপীল অথবা রিভিউর জন্য ঊর্ধ্বতন আদালতের দ্বারস্থ হইতে পারিবে”। কারন সাধারণত রিভিউ করা হয় সংশ্লিষ্ট আদালতের রায় বা আদেশের কেরানিক ভুলের জন্য সেই আদালতে। ঊর্ধ্বতন আদালতের দ্বারস্থ হতে হলে রিভিশন করতে হবে। ১৬(২) ধারাতে রিভিউ এর স্থলে রিভিশন কথাটি যোগ করতে হবে।

১.১২ সুপারিশমালা

  • আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেন নির্যাতন করে তাঁর গভীরে যেয়ে গবেষণা করে তথ্য বের করে আনা জরুরী। আইন করে জবাবদিহিতার আওতায় আনার পর ও গোয়েন্দা পুলিশের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও মাঠ পর্যায়ের পুলিশকে মানবাধিকার বিষয়ক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নির্যাতন বন্ধে কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।  শুধু রাষ্ট্রীয় নয় পারিবারিক,সামাজিকসহ সকল প্রকার নির্যাতন বন্ধে এই আইন প্রয়োগ করতে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
  • আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মৌলিক প্রশিক্ষণে শিশু অধিকার ও কিশোর অপরাধীদের বিষয়ে করনীয় সম্পর্কে ধারণা দেয়া প্রয়োজন। শিশুদের জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে অন্যান্য অপরাধীদের মতো অনুসৃত পন্থা অবলম্বন না করে শিশু বান্ধব পুলিশের বিশেষ ইউনিট চালু করা প্রয়োজন।
  • জাতিসংঘ নির্যাতন বিরোধী কনভেনশনে নির্যাতনের সংজ্ঞার আলোকে নির্যাতন বলতে শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা ছাড়াও শক্তি প্রয়োগ বা ভীতি প্রদর্শন বা হুমকি প্রদর্শন বা কোন প্রাতিষ্ঠানিক বা আইনগত অবস্থান কে কাজে লাগিয়ে অন্য কোন উদ্দেশ্যে প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষ নির্যাতনকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
  • নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বলতে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির পরিবার এবং আইনগত উত্তরাধিকারকে অন্তর্ভুক্ত করা ও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী  বলে স্বীকার করে নেয়া উচিত।
  • ক্ষতিপূরণ আদায়ের ক্ষেত্রে মামলার যে কোন পর্যায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির  অর্জিত অস্থাবর বা স্থাবর সম্পত্তি আটক,অবরুদ্ধ বা বাজেয়াপ্ত করার বিধান থাকতে হবে এবং দোষী সাব্যস্ত হলে আদালত কর্তৃক আদেশকৃত অর্থদণ্ডের অর্থ  ভিকটিম বা তার পরিবারকে  যৌক্তিক পরিমাণে ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য  আদেশ আদালত কর্তৃক সরাসরি দিতে হবে।
  • এই আইনের ৪ ধারায় “ এখতিয়ারধীন কোন আদালতের সামনে” বলতে সুস্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। সকল নির্যাতিত ব্যক্তি দায়রা জজের সামনে হাজির হয় তা এমনটা নয়; জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট,যুগ্ম দায়রা জজ, অতিরিক্ত দায়রা জজ বা দায়রা জজ আদালতের সামনে হাজির হওয়া কোন নির্যাতিত আসামীকে পরীক্ষা করা ও চিকিৎসকের নিকট দেহ পরীক্ষার আদেশ দেয়ার ক্ষমতা থাকা উচিত। আবার আসামী জেল কর্তৃপক্ষ দ্বারা নির্যাতিত হলে কিভাবে অভিযোগ দায়ের করবে তাঁর বিধান থাকা প্রয়োজন।
  • এই আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী পুলিশ দ্বারা সঠিকভাবে তদন্ত সম্ভব নয় সেক্ষেত্রে আদালত বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবেন। প্রকৃতপক্ষে তদন্তের বিষয়টি অভিযোগকারী আবেদন করার সময় বিচার বিভাগীয় তদন্ত চাইতে পারবেন। মনে রাখা প্রয়োজন যে সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ সে সংস্থা দ্বারা তদন্ত করা হলে মামলার আলামত থাকবে না নষ্ট হবে আর অন্যান্য সকল বিষয় সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত ভাবে করা সম্ভব হবে না। তাই নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্ত সংস্থার সদস্য ভিন্ন অন্য কর্তৃপক্ষকে দেয়া উচিত।

নির্যাতনের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দেশে বিদ্যমান আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষ ও আইনজীবীদের অসচেতনতা,দীর্ঘমেয়াদি বিচার প্রক্রিয়া, ভিক্টিম ও সাক্ষীদের সুরক্ষার অভাব, জনবিরোধী প্রশাসন, দারিদ্র্য ও অসচেতনতা এবং নির্যাতনকারীদের প্রভাব ইত্যাদি কারণগুলোই মূল প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে। ২০১৩ সালে প্রণীত আইনের কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে নির্যাতিত ব্যক্তির পক্ষে ন্যায়বিচার পাওয়া অনেকাংশে সম্ভব এবং আইনটির নাম  “নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন” না হয়ে “হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু (নিবারণ) আইন”  হওয়া শ্রেয়। আমাদের লক্ষ্য হল একটি ন্যায়বিচারভিক্তিক  সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করা যেখানে যন্ত্রণাকর ও ক্ষতিকর পরিবেশ সমূলে ধ্বংস করে স্রষ্টা যেভাবে প্রতিটি জীবনকে সুনিপুণভাবে এঁকেছেন সেখানে আমরা কোন একটি জীবনকে রঙহীন করে দিতে পারি না।

[1] প্রথম আলো, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০০৯।

[2] রাইসুল ইসলাম সৌরভ,  “নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতন নিবারণে আশার সঞ্চার”, বিডি নিউজ ২৪, ৩০ নভেম্বর ২০১১।

[3] আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক প্রথম আলোকে বলেন,‘দেশে প্রচলিত যে মূল আইন,যে আইনে আদালত চলে,সে আইন অর্থাৎ ফৌজদারি কার্যবিধির সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ কতগুলো ধারা আইনটিতে সংযোজন করা হয়েছে। আইনটি নিয়ে সংসদে যেভাবে আলোচনা হওয়া দরকার,তা হয়নি,সংসদীয় কমিটিতে যায়নি। এ জন্য আইনটিতে অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়েছে। এ আইনের বিষয়ে অনেক সাংসদই জানেন না। তাই আমরা এ অসংগতিগুলো দূর করতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছি।’ রোজিনা ইসলাম, “নিজেদের সুবিধায় আইনের সংশোধন চায় পুলিশ”, প্রথম আলো, ০৫ মার্চ, ২০১৫।

[4] রোজিনা ইসলাম, “নিজেদের সুবিধায় আইনের সংশোধন চায় পুলিশ”, প্রথম আলো, ০৫ মার্চ, ২০১৫।

[5] নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর,অমানবিক,লাঞ্ছনাকর আচরণ  অথবা দণ্ডবিরোধী সনদের ৪ (২)অনুচ্ছেদ ।

[6] কামাল আহমেদ, “হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু নিবারণ”, প্রথম আলো, ২৭ অক্টোবর ২০১৩।

[7] সোহরাব হাসান, “পুলিশের আবদার!”,প্রথম আলো, ১২ মার্চ ২০১৫।

[8] গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধান ১৯৭২ এর ২১(২) অনুচ্ছেদে আছে, “সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য”।

[9] শেখ হাফিজুর রহমান,“পুলিশের সম্ভাষণ,অতঃপর গুলিবর্ষণ!”,প্রথম আলো ,২৭ মে,২০১৫ ।

[10] মোস্তাফিজুর রহমান বিপ্লব, “পুলিশের শাস্তি ক্লোজ বা বদলি”, দিনকাল, ২২ মে ২০১৫।

[11]  সূত্রঃ http://www.askbd.org/ask/2015/05/05/death-law-enforcing-agencies-january-april-2015/

[12] যুগান্তর, ৭ এপ্রিল, ২০১৫।

[13]  ব্লাষ্ট বনাম বাংলাদেশ, ৫৫ ডি এল আর ৩৬৩ ।

[14] সাইফুজ্জামান বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য, ৫৬ ডি এল আর (২০০৪)।

[15] তদেব।

[16]  নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন,২০১৩ ধারা ২(৬)।

[17]  United Nations Convention against Torture and other Cruel, Inhuman or Degrading Treatment or Punishment, 1984 Article 1.

[18]  Association for the Prevention of Torture, http://www.apt.ch/en/torture

[19]  Mental pain or suffering refers to prolonged mental harm caused by or resulting from—

(A) the intentional infliction or threatened infliction of severe physical pain or suffering;

(B) the administration or application, or threatened administration or application, of mind altering substances or other procedures calculated to disrupt profoundly the senses or the personality;

(C) the threat of imminent death; or

(D) the threat that another individual will imminently be subjected to death, severe physical pain or suffering, or the administration or application of mind-altering substances or other procedures calculated to disrupt profoundly the senses or personality.

[20] The Optional Protocol to the Convention Against Torture (OPCAT)-2006. 

[21]  United Nations Convention against Torture and other Cruel, Inhuman or Degrading Treatment or Punishment, 1984 Article 5

“1. Each State Party shall take such measures as may be necessary to establish its jurisdiction over the offences referred to in article 4 in the following cases:

(a) When the offences are committed in any territory under its jurisdiction or on board a ship or aircraft registered in that State;

(b) When the alleged offender is a national of that State;

(c) When the victim is a national of that State if that State considers it appropriate.

  1. Each State Party shall likewise take such measures as may be necessary to establish its jurisdiction over such offences in cases where the alleged offender is present in any territory under its jurisdiction and it does not extradite him pursuant to article 8 to any of the States mentioned in paragraph I of this article.
  2. This Convention does not exclude any criminal jurisdiction exercised in accordance with internal law.”

[22] নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন,২০১৩ এর ধারা ২(৪)।

[23]  নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন ২০১৩ এর ২(৮) ধারা।

[24] Mehboob Batcha v. State, (2011) 7 SCC 45.

[25] United Nations Convention against Torture and other Cruel, Inhuman or Degrading Treatment or Punishment, 1984 Article 15, “Each State Party shall ensure that any statement which is established to have been made as a result of torture shall not be invoked as evidence in any proceedings, except against a person accused of torture as evidence that the statement was made.”

[26] নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ)আইন,২০১৩ এর ৫(২)।

[27] United Nations Convention against Torture and other Cruel, Inhuman or Degrading Treatment or Punishment,1984 Article 14(1)-“Each State Party shall ensure in its legal system that the victim of an act of torture obtains redress and has an enforceable right to fair and adequate compensation, including the means for as full rehabilitation as possible. In the event of the death of the victim as a result of an act of torture, his dependants shall be entitled to compensation.”

[28] Penal Code 1860, section 302 “Whoever commits murder shall be punished with death, or [ imprisonment] for life, and shall also be liable to fine.”

About The Writer

Article Author Image

Dr. Md. Abdul Alim

Associate Professor, Department of Law, University of Rajshahi.

E-mail : alimlaw05@gmail.com

Share:  



Welcome To "Law Journal BD"

Rafiqul Haque

“Law Journal BD” is a timely and innovative step towards the growth and development of law. The Journal is a combination of articles from experts which will broaden the scope of our legal instrument and jurisprudence. I sincerely hope the initiative will help the lawyers to be more informed & committed to struggle for justice. It would be more appropriate to consider it as a work of compilation of contributions from various jurists, practitioners and academicians. The “Law Journal BD” publishes articles on all aspects of law.

I deeply appreciate the efforts of the Editor and the whole team of “Law Journal BD”. It is a great contribution to Bangladesh judiciary. The journal publishes articles on all areas of law and I believe the articles will be very helpful to researchers, legal scholars, practitioners, law consultants and moreover to Law students. I am really thankful to both , who are contributing their valuable articles for publication and who are reading the articles for enhancing knowledge of law.


Thanks to all the readers of “Law Journal BD”.


Barrister Rafique - Ul Huq

Senior Advocate, Supreme Court of Bangladesh

Chief Advisor, “Law Journal BD”

Mahfuzur Rahman

The “Law Journal BD” is the first Online Law journal in Bangladesh which specifically publishes law articles only. You will find here different kind of research based articles on various Law topics. The primary function of the journal is to publish lengthy comprehensive treatments of articles generally written by law academicians, Judges, or legal practitioners. A significant feature is that the distinguished writers analyze judicial decisions, contemporary developments of law, legislation and current law reform.

The important features of the journal are the sections of Book Review and Biography of renowned person in legal field. The articles are published as a six months volume & then it will be found in the “Previous Publications” section. The “Law Journal BD” has the efficient team of learned advisors and experienced team of editors. All articles are subjected to a rigorous editorial process in order to strengthen substance, polish tone and ensure citation accuracy.



We thank you sincerely for reading “Law Journal BD”.


Barrister Md. Mahfuzur Rahman (Milon)

Advocate, Supreme Court of Bangladesh

Editor, “Law Journal BD”